১.
মফিজের প্রথমবারের মতো কেন্দুয়ার সড়ক ধরে ছুটে যাওয়ার ঘটনাটি গ্রামের কোনো বাসিন্দার চোখে পড়ে না। এই চোখে না পড়ার নানারকম কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, মফিজ ছুটছিল এক এজমালি রাস্তা ধরে। গ্রামের যেকোনো বাসিন্দা চাইলেই তার ওপর ছুটতে পারে। এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। দ্বিতীয়ত, তাদের গ্রাম কেন্দুয়া, কেন্দুয়ার পাশে সুন্দরবন, আর করাতিয়া নদী – এই তিনের সংযোগস্থলে নবনির্মিত কেন্দুয়া পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তাদের গ্রামের ওপর দিয়েই প্রতিনিয়ত ইউরেনিয়াম আর মিক্সড অক্সাইড ফুয়েল বয়ে নিয়ে যায় পেল্লায় সাইজের একেকটা ট্রাক। তাতে গ্রামের বাজারের সরু সড়কে প্রায়ই জ্যাম বেঁধে যায়। পেল্লায় সাইজের ঐ ট্রাকগুলো একবার রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে গেলে তার আশেপাশে আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো ছুটন্ত মফিজকেও গ্রামবাসী এ জন্যই দেখতে পায়নি। সে ট্রাকের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল। তবে, মফিজের কারো নজরে না পড়ার মূল কারণ সম্ভবত এটা যে – সে সময় কেন্দুয়া বাজারে নতুন একখানা সুপারশপ খোলা হচ্ছিল। গ্রামের পাশে রাশিয়ার আর্থিক প্রণোদনায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর এলাকায় বিদেশিদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। তাদের সুবিধার্থেই কেন্দুয়া বাজারে খোলা হচ্ছিল একের পর এক নতুন নতুন দোকান। এবারের সুপারশপটা ছিল ভিন্ন, কারণ বিলবোর্ডে ওটার নামও লেখা ছিল রুশ ভাষায়। গ্রামের ছেলেবুড়ো সবাই একত্র হয়ে হাঁ করে দেখছিল মালসামান আর আলোর রোশনাই- এ চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া নতুন দোকানটি। ভাবছিল, এতে তাদের প্রবেশাধিকার থাকবে কিনা। ফলে ছুটন্ত মফিজ তাদের নজরে পড়েনি।
কেন্দুয়ার লোকজন ইদানীং এমনিতেই নানামুখী বিহ্বলতায় আক্রান্ত। এইতো, কিছুদিন আগেও সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এ গ্রামে মানুষের দিন শুরু হতো রাতা মোরগের ডাকে পুবাকাশের পেট চিরে গেলে, আর কর্মচাঞ্চল্যে পরিপূর্ণ সাধারণ একটি দিনের সমাপ্তি ঘোষিত হতো গ্রামের বাঁশঝাড়গুলোতে জোনাকি পোকার আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠলে। এখন, কেন্দুয়ার সীমানা ঘেঁষে যে পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, তার ফ্লাডলাইটের জ্বালায় দিন-রাতের ফারাক করা মুশকিল হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে পুরো গ্রামে বিনোদনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি বলতে ছিল কেবল গ্রামের মোড়ল জাকির চেয়ারম্যানের বাড়ির চৌদ্দ ইঞ্চির রঙিন টেলিভিশন। সাঁঝ হলে চেয়ারম্যান তার বসার ঘরের টিভি চালিয়ে জানালা খুলে দিলে উঠান ভর্তি মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়তো তার ওপর। আবার ঘড়ির কাঁটায় রাত আটটা বাজলে জানালা ভেতর থেকে আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যেতো। গাঁয়ের লোক যে যার মতো উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে রওনা দিত যে যার বাড়ির দিকে। আর এখন গাঁয়ের প্রায় সবার মুঠোয় আধা হাত করে লম্বা একেকটা স্মার্টফোন। তাতে বুঁদ হয়ে আছে সবাই, আর গুনছে মাশুল। ধরুন, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পেটে চাপ দিলে, সে চাপ হালকা করতে রাস্তার ধারেই কোনো বড়ো গাছের আড়ালে হাগতে বসে যাওয়া গ্রামের লোকজনের নৈমিত্তিক অভ্যাস। সেদিন গ্রামের বুড়ো আবুল চাচা হাট থেকে ফেরার পথে ওরকমই একটু বসেছিলেন পেট খালি করার নিয়তে, রাস্তার ধারে, এক গাছের আড়ালে। অমনি তার ঠিক পাশের ঝোপে ভেসে উঠলো এক সাদা দেওয়ের মুখ। চাচা মিয়া লুঙ্গি কাঁধের ওপর ফেলে লাফিয়ে উঠে এলেন পাকা রাস্তায়। মুখে গাজি পীর, বনবিবি, আর মা মনসার দোহাই। বিহ্বল চাচার পিছু পিছু সে দানোও বেরিয়ে এলো ঝোপের আড়াল থেকে। হাতে লম্বা মোবাইল, চেহারা স্ক্রিনের সাদা আলোয় আলোকিত। প্রযুক্তিগত বিহ্বলতার পাশাপাশি, গাঁয়ের ছেলেপুলে ফতুয়া লুঙ্গি ছেড়ে সব থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর বুকে ম্যারিলিন মনরোর ছবি সাঁটা টিশার্ট পড়ে ঘুরছে। মাছভাতের বদলে মনোহারী দোকান থেকে কিনে খাচ্ছে বার্গার আর হটডগ। রুশিদের সহায়তায় কেন্দুয়ায় এ পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার পর গ্রামের আর কোনোকিছুই আগের মতো থাকে নি। মফিজের হঠাৎ করে ছুটতে আরম্ভ করা সে হিসেবে কোনো ঘটনাই নয়।
কেন্দুয়ায় এই পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে, মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো, হঠাৎ করেই সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই অজ পাড়াগাঁয়ের ওপর পুরো দেশের মানুষের মনোযোগ গিয়ে পড়েছে। ফলে কেন্দুয়ার অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নতি সাধনের জন্য – ‘জীবন আপনার, উন্নয়নের দায়িত্ব আমাদের’ – টাইপের স্লোগানসমৃদ্ধ ব্যানার নিয়ে বেশ কয়েকটা এনজিও কেন্দুয়ায় এসে নিজেদের মাঝে কামড়াকামড়ি শুরু করে দিয়েছিল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। শেষমেষ টিকেছে একটা। এখন তার এডুকেশন উইং সকালবেলা বাচ্চাদের আর সন্ধ্যায় গাঁয়ের বুড়োদের মধ্যে সাক্ষরতা প্রকল্প পরিচালনা করে। আর তার তার মেডিক্যাল উইং নিয়মিত মানুষের পাছায় ইঞ্জেকশন ফুটাতে আর প্যাকেটে করে কি সব বড়ি আর বেলুন বিতরণ করায় ব্যস্ত থাকে। যে প্যারামেডিক মেয়েটি এই প্যাকেটে ভরা বেলুন বিতরণ করে, সে চোখের পাতি না ফেলে ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে সবাইকে বলে এই বেলুন সেক্স করবার আগে নিজের নুনুর ডগায় লাগাতে, তাহলে নাকি যৌনবাহিত রোগ আর মেয়েদের অপরিকল্পিত গর্ভধারণ রোধ করা যাবে। তার এই বেহায়াপনায় গ্রামের পুরুষদের চেয়েও বেশি বিরক্ত হয় গ্রামের বয়স্ক নারীরা। দেদারসে বিলানো ঐ সব প্যাকেটজাত বেলুন তারা দেদারসে বিলিয়ে দেয় মাজায় মাদুলি বাঁধা গ্রামের ন্যাংটো বাচ্চাগুলোর মাঝে। তারা কনডমগুলোকে ফুলিয়ে বেলুন বানায়। সেই বেলুন উড়ে চলে গ্রামের তালগাছের মাথার ওপর দিয়ে। দক্ষিণ দিক থেকে ভেসে আসা সমুদ্রের নোনা হাওয়া প্যারামেডিক ভদ্রমহিলাকে আলতো করে ধাক্কা দিলে সে উদাস দৃষ্টিতে উড়ন্ত কনডমের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর শহরে রেখে আসা তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
পারমাণবিক কেন্দ্রের ফ্লাডলাইট, লম্বা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট, এবং এনজিওর শিক্ষাকার্যক্রম কেন্দুয়াবাসীদের জীবনে পর্যাপ্ত আলোকপাত করলেও, তাদের অন্তরের গহিনে লুক্কায়িত এক ভিন্নধর্মী আঁধারের উপস্থিতি সুদূর ইউরোপ থেকে টের পায় একদল মিশনারি। নিরক্ষর অসহায় বাদামি বর্ণের এই মানুষগুলোর প্রতি বুক ভরা ভালোবাসা নিয়ে সে মিশনারি টিম দলবল নিয়ে ছুটে আসে কেন্দুয়ায়। শুরু করে সুন্দরবনের কোলে বেড়ে ওঠা এ মানবসন্তানগুলির মাঝে যীশুখ্রিস্টের বাণী প্রচার। সত্যি বলতে, কেন্দুয়ার তরুণদের অন্তর তখন লম্বা ফোনে সংযুক্ত ইন্টারনেটের বদান্যতায় ভালোই কলুষিত। পর্নোগ্রাফির পাশাপাশি, তারা তখন অনলাইনে সদ্য রপ্ত করা জাতীয়তাবাদী বিষ উদ্গিরণচর্চায় মশগুল। ক্রিকেট খেলায় পাশের দেশ ভারতকে তাদের নিজেদের দেশ হারাতে পারে না প্রায় কখনোই। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমের অন্ধভক্ত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের এই তরুণগুলো হঠাৎই আবিষ্কার করে, খেলায় না পারলেও, বিবিধ লাইভ স্ট্রিমিং চ্যানেলগুলোর কমেন্ট সেকশনে ভারতকে গালি দিয়েও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় যথেষ্ট সুড়সুড়ি পাওয়া যায়। তো একবার কমেন্টবক্সে ভারতকে গালি দিতে গিয়ে ভারতীয় সমর্থকদের সম্মিলিত বাটাম খেয়ে কেন্দুয়ার এক ছেলে ভয় পেয়ে যায়। ভারতীয় ক্রিকেট টিমের সমর্থকেরা তাকে থ্রেট দেয় যে তারা তাকে বাংলাদেশে এসে কেলিয়ে দিয়ে যাবে। প্রবল ভীতিতে আক্রান্ত হয়ে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যীশুখ্রিস্টের চরণতলে আশ্রয় নেয়ার। খ্রিষ্ট তার আধ্যাত্মিক উন্নতিতে কতটুকু সহায় হবেন, তা তার জানা ছিল না। তবে শ্বেতাঙ্গ মিশনারিদের আঁচলের তলে আশ্রয় নিলে কালো গাত্রবর্ণের কারো পক্ষে তাকে ঘাঁটানোর সাহস হবে না – এই ছিল তার বিশ্বাস।
২.
তো এই যখন কেন্দুয়ার সামগ্রিক অবস্থা, এমন সময় হঠাৎ মফিজ দৌড়ানো শুরু করলো কেন? লোহার মতো পেটা শরীরে তেল চর্বির বালাই নেই তার। অলেম্পিক গেমসে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন সে পোষণ করে, এমনটাও কাউকে জানায়নি কখনো। তবে?
জন্ম ঠিক এ অঞ্চলে নয় মফিজের। খুব ছোটোবেলায় কীভাবে কীভাবে করে সে যেন কেন্দুয়ায় এসে আশ্রয় নেয়। সঙ্গে ছিল না কেউ। তার ঠিকুজীকুলুজী, বাপ মায়ের হদিশ নির্ণয় আর সম্ভব হয়নি। তিনকুলে কেউ নেই জেনে ছোটোবেলা থেকে নিজের গতরখানাকে অবলম্বন করেই বেঁচেছে সে। আগ বাড়িয়ে সর্বদা সাহায্য করেছে গ্রামের সবাইকে, যার যার কাজে। কারো ঘরের চালা ক্ষয়ে গেছে শুনতে পেলে নিজ থেকেই টিনের চাল বেঁধে, বা ছন রুয়ে সে মেরামত করে দিত ওটা। গাঁয়ের মোড়লের হাউস হয়েছে নতুন পুকুর কাটার, মফিজ বিনিমাগনাতেই কোদাল নিয়ে লাফিয়ে পড়তো। একইভাবে রাস্তাঘাট মেরামত, গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা করাতিয়া নদীর বাঁধ সারাই, খেত চষা, ফসল বোনা, ফসল কেটে ঘরে তুলে দেয়া, গাছ থেকে নারকোলটা ডাবটা পেড়ে দেয়া, মাছ মারা, সুন্দরবনে মৌয়ালদের সাথে মিলে মধু আহরণে যাওয়া– এ সবই করত সে বিনিপয়সায়। কেবল তাকে দু’বেলা পেটেভাতে রাখলেই চলত। কখনো আবার হাতে বানানো ডোঙায় করে করাতিয়ায় বেরিয়ে পড়তো। ভাসতে ভাসতে চলে যেতো নদী পেরিয়ে সমুদ্দুরে। দিনান্তে আবার গাঁয়ে ফিরে আসতো, সাথে করে গভীর সমুদ্রের দু’একটা পেল্লায় সাইজের মাছ নিয়ে। জাল নাই; জাল কেনার, বা বোনার, মায় ধার করার পয়সা পর্যন্ত নাই, তবুও কীভাবে সে খালি হাতে সমুদ্র থেকে এত বড় মাছ ধরে নিয়ে আসতো, এ নিয়ে সবার বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। গাঁয়ের বুড়িরা বলত, মফিজ সাক্ষাৎ বনবিবির ছেলে।
নছিমনের সঙ্গে মফিজের বিয়ে হয় এই তো, ক’বছর আগে। শৈশবে মা মারা যাওয়ার পর নছিমন লালিত পালিত হয়েছে সৎমায়ের সংসারে। তারপর সে ডাঙর হয়ে উঠলে তার বাবাও একদিন মারা পড়ে সুন্দরবনের গহিনে মধু আনতে গিয়ে, বাঘের খপ্পরে পড়ে। তারপর তাকে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিয়ে বিদায় করেছে তার সৎমা। যাইহোক, অগ্রহায়ণ মাসের সে বিয়েতে গোটা গাঁ তখন আমন ধানের ঘ্রাণে ম’ ম’ করছে। পাকা ধানের মিঠে ঘ্রাণ এই দুই তরুণ প্রাণের মাঝে দোলা দিয়ে গিয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। তবে গ্রামের মানুষের বিবেচনায় উদাস মনের মফিজ, আর বাপ মা হারা নছিমনের জুড়িটা হয়েছিল একদম সোনায় সোহাগা। গ্রামের স্বাভাবিক আর দশটা দম্পতির মতোই, নানাবিধ অভাব অনটনের সঙ্গে লড়াই করে তারা সংসার করে যাচ্ছিল।
৩.
শিশু শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, টিকা দান এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পাশাপাশি কেন্দুয়ায় সক্রিয় এনজিওটি এরমধ্যে এক ভিন্ন ধাঁচের কর্মযজ্ঞ হাতে নেয়। তারা গাঁয়ের মেয়েদের ক্ষুদ্র – কুটির শিল্প শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করে। নানারকম হাতের কাজ, যেমন – সেলাই, বেতের ঝুড়ি, শীতলপাটি, তৈজসপত্র ইত্যাদি তৈরি করা শিখিয়ে, মেয়েগুলিকে তারা কাঁচামাল কেনার ক্ষুদ্র ঋণও দিত। সেই পয়সায় মালসামানা কিনে, জিনিসপত্র তৈরি করে, তা হাটে বিক্রি করতো। বিক্রির টাকা থেকে ঋণ শোধের পর যে দু’পয়সা লভ্যাংশ থাকতো, তা আবারও খাটাতো ব্যবসার কাজে।
নছিমনও তাদের সঙ্গে ভিড়ে যায়।
নছিমন করতো মূলত সেলাইয়ের কাজ। হাতের কাজে সে তার দলের সেরা সদস্য ছিল না। তার চেয়ে সেলাইয়ে দক্ষ এমন আরও মহিলা ছিল। কিন্তু নছিমন তার প্রশিক্ষকদের চোখে পড়ে ভিন্নভাবে। তারা লক্ষ্য করে, মেয়েটা সূচের ফোঁড়ে সবসময় গল্প ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। যে কাঁথাতেই সুঁই ফোটায়, তা পরিণত হয় এক রূপকথার রাজ্যে। এভাবেই সে এনজিও অফিস থেকে বিশেষ প্রণোদনা পেতে শুরু করে সে। তার কাজের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও। আর নছিমনের কাজের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মফিজের সঙ্গে তার কাটানো সময়ের পরিমাণ কমতে থাকে।
মফিজ একদিকে খুশী হয়। সে নিজে সারাদিন বাড়ির বাইরে এ কাজ সেকাজে ব্যস্ত থাকলেও তার বউটা তো সারাদিন একাকীই পড়ে থাকতো ঘরে। এখন বৌটির নিজের মতো ব্যস্ত থাকার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার মনের ভেতর যে শঙ্কা কাজ করে, সেটাকেও মফিজ পুরোপুরি গিলে ফেলতে পারে না। বৌটিকে আর নিজের মতো করে তেমন একটা পায় না সে। এদিকে তাদের টোনাটুনির সংসারে বাইরের লোকের আনাগোনাও বেড়ে গেছে অনেক। বিশেষ করে এনজিওর প্রধান নির্বাহী জামান স্যার প্রায় প্রতিদিনই বাড়িতে এসে নছিমনের কাজের খোঁজ খবর নেয়। আগে ভদ্রলোক প্যারামেডিক আপাকে সহ আসতো। ইদানীং একাই আসা শুরু করেছে। সব মিলিয়ে মফিজের ব্যাপারটা ভালো লাগে না। কিন্তু অভিযোগটা ঠিক কি নিয়ে করা যায়, মফিজ সেটাও বুঝে উঠতে পারে না।
মফিজ একদিন বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করে, নছিমনের হাতে লম্বা মোবাইল। এনজিও থেকেই নাকি দিয়েছে। স্মার্টফোন জিনিসটা আদতে কি – এটা নিয়ে মফিজের বিস্তারিত ধারণা ছিল না। যখন নছিমন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো যে এই যন্ত্র দূরালাপনির কাজ করে, সে ভাবল এটা দিয়ে সম্ভবত মৃত মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। যন্ত্রখানা এসেছে সাদা মানুষদের দেশ থেকে (আসলে ভেতরের যন্ত্রপাতি চায়নার, জোড়া দেয়া হয়েছে হংকং এ), তাদের এই গাজি পীর, মা মনসা আর বনবিবির থানে। দুইয়ে মিলে মুর্দাদের সঙ্গে এই যন্ত্র দিয়ে যোগাযোগ অসম্ভব কিছু মনে হয় না। কিন্তু যখন তাকে নছিমন বুঝিয়ে বলে যে, মুর্দা নয়, এই যন্ত্র দিয়ে কেবল জীবিত মানুষদের সঙ্গেই যোগাযোগ করা যায়, তখন মফিজ আবারও অবাক হয়। কারণ, সে ছাড়া তার স্ত্রীর তো তিনকুলে জীবিত আত্মীয় বলতে কেউ নেই। তাহলে তার এ দূরালাপনি লাগবে কার সঙ্গে আলাপ করতে? এই প্রশ্নটাই ইনিয়ে বিনিয়ে নছিমনের সামনে উপস্থাপন করলে নছিমন ফিলটার দিয়ে তার সদ্য তোলা কিছু সেলফি স্বামীকে দেখায়। একটি সেলফিতে নছিমনের পেছনে জামান স্যারকেও দেখা যায়। কিন্তু মফিজ কিছু বলে না। ফিলটার ব্যবহার করে তোলা ছবিতে তার স্ত্রীর বর্ধিত সৌন্দর্য দেখে তার বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা কাজ করতে থাকে। সে নিজে এতদিনে তার স্ত্রীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারেনি, অথচ এই যন্ত্র দু’দিনেই সেটা ধরতে পেরেছে – এই দুঃখ সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। সে গভীর আবেগে তার বৌকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। নছিমন তেমন একটা আগ্রহ দেখায় না।
এরপর মফিজের নছিমনের সাথে কাটানো সময়ের পরিমাণ আরও কমতে থাকে। প্রায় দিন বাড়ি ফিরে সে দেখে তার বৌ একমনে সেলাইয়ের কাজ করছে। আর গভীর রাতে কখনো সখনো ঘুম ভেঙে গেলে সে তার স্ত্রীকে আবিষ্কার করে ঐ যন্ত্রের সঙ্গে আলাপচারিতায় রত অবস্থায়।
বউটা কি আমার পাগল হয়ে গেলো? একা একা যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলে কেন সে?
মফিজ ভাবে।
৪.
তার আর নছিমনের সম্পর্কে যে স্পার্ক নাই, এটা মফিজ প্রথমবারের মতো জানতে পারে এনজিও নির্বাহী জামান সাহেবের মাধ্যমে।
সেদিন মফিজ আরও তিনকুড়ি কামলার সঙ্গে মিলে গাছ লাগাচ্ছিল করাতিয়া নদীর তীর ঘেঁষে। গাঁয়ের এনজিওর নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। এই জায়গায় আগেও সুন্দরী গাছের ঘন জঙ্গল ছিল। মাসখানেক আগে, প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সে বর্ষীয়ান সুন্দরী গাছগুলিকে পাঁচ কুড়ি কামলা মিলে কেটে সাফ করে দেয়। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আরও জায়গা লাগবে, এই ছিল বন উজাড় করার কারণ। মফিজকে তখনো গাছ কাটার জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সে রাজি হয়নি। এই প্রাচীন সুন্দরী গাছগুলো গাজীপীর, মা মনসা, আর বনবিবির আবাস। যাদের কোলে কাঁখে সে বড়ো হয়েছে, তাদের আবাস উজাড় করার মতো নিমকহারামি করতে নিজের মনকে সে রাজি করাতে পারেনি। গাছকাটার খবর কীভাবে কীভাবে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছে গেলে পরিবেশবাদীরা সরব হয়ে ওঠে। বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো ঘেরাও অবরোধ কর্মসূচি গ্রহণ করে। টেলিভিশনের নিউজ চ্যানেল আর পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট হয়। সরকারও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। ফলে এই জায়গায় আবারও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সুন্দরী গাছের চারা রোপণ কর্মসূচি নেয়া হয়। আয়রনিটা এ জায়গায় যে গাছ কাটার মতো গাছের চারা রোপণের দায়িত্বও দেয়া হয় সে এনজিওকে। এবার আর মফিজের কাছে কামলা খাটার প্রস্তাব পাঠানো লাগে না। সে একাই গিয়ে হাজির হয় গাছ লাগাতে। কেনই বা ওসব বর্ষীয়ান গাছ কাটা হলো, আবার কেনই বা এখন আবার গাছ লাগানো হচ্ছে – মফিজ বুঝতে পারে না। জগত বড় জটিল জায়গা।
সে গাছ লাগাতে লাগাতেই দেখতে পায়, জামান স্যার দূরে দাঁড়িয়ে কাজ তদারকি করছেন। তাকে দেখে মফিজের মনে পড়ে, নছিমন এই লোকটাকে খুব সম্মান দিয়ে কথা বলে। তাই মফিজ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ওনার সঙ্গেই নছিমনের সঙ্গে তার সম্পর্কের শীতলতার ব্যাপারটা ভাগ করে নেবে সে। উনি বিজ্ঞ মানুষ। শহর থেকে এসেছেন। এতোবড় প্রতিষ্ঠান চালান। হয়তো কিছু বলতে পারবেন। মফিজের ভুলত্রুটি থাকলে ধরিয়ে দিতে পারবেন।
মফিজকে দেখেই জামান স্যার ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেন। চেষ্টা করেন ওকে ঝেড়ে ফেলার। তবে মফিজ ফেউয়ের মতো লেগে থাকলে অবশেষে সে চেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে ওর পুরো কথা শোনেন। তারপর সংক্ষেপে বলেন –
“তোর আর তোর বৌয়ের তো বনছে না রে মফিজ। তোদের রিলেশনে স্পার্ক নাই।“
বৌয়ের সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছে না, মফিজ এটা বুঝলেও বনিবনা না হওয়ার কারণটা সে ধরতে পারে না। স্পার্ক নাই, বললেন তিনি। তা এই স্পার্ক জিনিসটা কি?
গাছ রোয়ার ফাঁকেই সে পাশের এক কামলাকে জিজ্ঞেস করে, “আইচ্ছা, স্পার্ক কি জিনিস?”
“ও হল ইলেকটিরিক জিনিস। ইলেকটিরিকের দোকানে পাওয়া যায়।“
সেদিন কামলা দেয়া শেষ করে মফিজ ছুটে গিয়ে হাজির হয় কেন্দুয়া বাজারের ইলেকট্রিশিয়ান তরিকুলের ওয়ার্কশপে। তরিকুল তখন গভীর মনোযোগে একটা রেডিও সারাই করছিল। তাকে ঐ অবস্থাতেই পাকড়াও করে মফিজ জানতে চায়, স্পার্ক কি জিনিস।
তরিকুল খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। তড়িৎ প্রকৌশলের ওপর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিগ্রি নেয়ার পর খুলনা সদরে দুই বছর বেকার বসে থেকে সে সরকারি চাকুরির জন্য চেষ্টা করে। এর ফাঁকে রাহা খরচ জোগানোর জন্য এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির টিউশনি করাতে হয়। বহু চেষ্টার পরেও ভাগ্যে সরকারি চাকরির শিকে না ছিঁড়লে সে হতাশ হয়ে কেন্দুয়া ফিরে এসে একটা ইলেকট্রনিকসের দোকান দিয়ে বসে।
দীর্ঘদিন পর যখন মফিজ তরিকুলের সামনে এসে তার পড়াশোনার বিষয়সংক্রান্ত একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, তরিকুল ঝাঁকি খায়। তার মধ্যে জেগে ওঠে দীর্ঘদিন মাটিচাপা দিয়ে রাখা প্রাইভেট টিউটর সত্তা। সে এককথায় বলে, “স্পার্ক হইলো প্রবাহিত ইলেকট্রনের ওভারফ্লো”। তারপর সে তার কালিঝুলি মাখা হাত পানিতে ধুয়ে, গামছায় হাত মুছে ওয়ার্কশপের এক কোনা থেকে টেনে একটা হোয়াইট বোর্ড আর মার্কার বের করে। টেবিলের ওপর হোয়াইট বোর্ডটা রেখে তার ওপর পরমাণু কাঠামোর ছবি এঁকে মফিজকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যাপারটা। ধনাত্মক আধান তথা প্রোটন, আর ঋণাত্মক আধান তথা ইলেকট্রন – এই দুইয়ের ভারসাম্যেই যে একটা পরমাণু তড়িৎ নিরপেক্ষ থাকে, এতকিছু মফিজের মাথায় ঢোকে না। সে কেবল বোঝে পরমাণুর কাঠামোর সঙ্গে প্রতীকী উপায়ে তার আর তার বৌয়ের সম্পর্ক তুলনা করলে ধনাত্মক আধান প্রোটন হচ্ছে তার বৌ, আর ঋণাত্মক আধান ইলেকট্রন হচ্ছে সে নিজে। আর তাদের সম্পর্কের পরমাণু কাঠামোতে ব্যালান্স না থাকার কারণ হচ্ছে তার নিজের আধানের ঘাটতি। আর আধানের এই ঘাটতি তাকে পূরণ করতে হবে ইলেকট্রনের মতো দৌড়ানোর মাধ্যমে।
“কিন্তু যে সে গতিতে ছুটলে তো হইব না,” মফিজকে চিন্তিত লাগে। “আপনে কইলেন, ছুটতে তো অইব প্রায় আলোর গতিতে। মানুষ হইয়া আলোর গতিত ছুটবো ক্যামনে?”
তরিকুল মফিজের জটিল সমস্যার সরল সমাধান প্রদান করে। মফিজকে অভয় দিয়ে বলে, আধানবাহী সামগ্রিক যে বিদ্যুৎ তরঙ্গ, তা আলোর বেগে ছুটলেও ক্ষুদ্র যে একক ইলেকট্রন পার্টিকেল, তার গতি তুলনামূলক কম। মফিজ যদি চেষ্টা করে, কে জানে, হয়তো সে সেই ক্ষুদ্র ইলেকট্রন পার্টিকেলের গতি অর্জন করে ফেলতেও পারে। সবই ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার।
মফিজের কাছে বিষয়টা আর জটিল লাগে না। সে অনুভব করে, স্পার্কের অভাবে নছিমনের সাথে তার সম্পর্কে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, সে দৌড়ে সে দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে।
এরপর মফিজ ছোটা আরম্ভ করে। মফিজ ছুটতে থাকে ডানে বামে, সামনে পিছে, ত্রিমাত্রিক অক্ষের সকল দিকে। মফিজ ছুটে চলে খেত খামার কর্মব্যস্ত মানুষের মধ্য দিয়ে। মফিজ ছুটে চলে নিস্তব্ধ একাকী মাঠের বুক চীরে। নদীর কিনার ঘেঁষে। মফিজ ছুটে চলে সকালে, দুপুরে, রাতে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায়। বায়ুর সাথে পাল্লা দিয়ে। শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে।
এমনকি, আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে।
৫.
এভাবে ঋতু বদলাতে থাকে। বছরের চাকা ঘোরে। গাঁয়ে রাশিয়ান শিরোনামে আরও নতুন নতুন দোকানপাট খোলা হয়। খুলনা – সাতক্ষীরা সংযোগ সড়কে পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এসব ধীর, ধারাবাহিক পরিবর্তন কেন্দুয়ার মানুষের চোখের রাডারে ধরা পড়ে না। স্বাভাবিক লাগে। কিন্তু করাতিয়া নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বুড়ো কলিমুদ্দি সাতসকালে দাঁতন করার সময় যেদিন করাতিয়া, তার তীরের বড়ো একখণ্ড মাটি খেয়ে নেয়, সেদিন পুরো গ্রাম জুড়ে হইচই শুরু হয়ে যায়। কেননা, নদীভাঙ্গন কেন্দুয়ার ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক ঘটনা। করাতিয়া বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা ক্ষুরধার স্রোতস্বিনী নদী, কিন্তু তার তীর জুড়ে সুন্দরী গাছ মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকায় নদী কখনো কেন্দুয়ার জমিনে কামড় বসানোর সাহস পায়নি। কিন্তু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে নদী তীরের গাছগুলো কেটে ফেলার পর এই প্রথমবারের মতো কেন্দুয়ার জমিনে করাতিয়া তার দাঁত বসিয়ে দেয়। গ্রামের বাসিন্দারা সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসে। নদীভাঙনের খবর উপজেলা নির্বাহীর কাছে পাঠানো হয়, কিন্তু গাঁয়ের ছেলেবুড়োরা সরকারি হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করে না। তারা নিজেরাই উপযাচক হয়ে বড়ো বড়ো বালির বস্তা ফেলে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
তবে এত সামান্যে তাদের সমস্যা শেষ হয় না, বরং অসংখ্য নতুন সমস্যা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে থাকে তাদের জনজীবনে। হঠাৎ এক সকালে কেন্দুয়া গ্রামের মানুষজন ঘুম থেকে উঠে লক্ষ্য করে, করাতিয়া নদীর পানির রং বদলে গেছে। প্রবহমান নদীর রং রক্তিম বর্ণের। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কতদিনের রাসায়নিক বর্জ্য একত্রিত হয়ে নদীর এ হাল করেছে তারা গুনে বের করতে পারে না। এর সমাধান কী হতে পারে এই নিয়ে জল্পনাকল্পনা করতে করতেই তারা চোখ কপালে তুলে লক্ষ্য করে, নদীর লাল পানির স্রোতে ভেসে আসছে ছোট-বড়ো অজস্র মরা মাছ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখে কেন্দুয়ার জনগণের অসহায় নসিবের মতোই আত্মসমর্পণ করা মরা মাছগুলো ভেসে চলেছে কই থেকে কই- কে জানে? অদূরে ঠায় দাঁড়ানো পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লি থেকে ভকভক করে বেরিয়ে আসা কালো, ধূসর, খয়েরি ধোঁয়া তাদের পরিচিত আকাশের রংও আজ অনেক দিন হয়, বদলে দিয়েছে। পরিবর্তনটা গুরুতর হলেও ধীরগতির বলে গাঁয়ের লোকেদের চোখে পড়েনি সেভাবে। আজ নদীর রং আর আকাশের রঙে ভীতিকর বৈসাদৃশ্য দেখা দিলে সবাই শঙ্কিত চোখে নদী তীরে রোপণ করা ছোট ছোট সুন্দরী গাছের চারাগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। দমকা হাওয়ার বুকে তীর তীর করে দুলতে থাকা এই তরুণ গাছগুলিই তাদের চোখের আশা ভরসার প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
যেদিন গাঁয়ের হিন্দুপাড়ায় মা মনসার মূর্তির কণ্ঠা জড়িয়ে একজোড়া জাত সাপের মরদেহ ঝুলে থাকে, আর মা মনসার মূর্তির চোখে অলৌকিকভাবে দেখা যায় রক্তিম অশ্রু, সেদিন গাঁয়ের হিন্দু অধিবাসীরা সবাই আশু বিপদের আশঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়ে। গাঁয়ের খেতে জন্মানো ফুল ফল শাকসবজি সবকিছু ক্রমশ নিষ্প্রাণ, বিস্বাদ, ম্যাড়মেড়ে হয়ে ওঠে। সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী অঞ্চলের পানিতে এমনিতেই আর্সেনিকের মাত্রা বেশি থাকে বলে পানির রং হলুদ হয়। তার পাশাপাশি ইদানীং ডিপটিউবওয়েল পানি তেতো লাগা শুরু হয়। গাঁয়ের লোকেরা একে একে সবাই এই উপলব্ধিতে পৌঁছায় যে আদতে সমস্যাটা কোথায়, কিন্তু যে মহাপ্রকল্পের উছিলায় লৌহ বেষ্টনীতে ঘেরা এলাকায় এত বড়ো বড়ো জ্বালানিবাহী গাড়ি অহরহ ঢুকছে আর বেরুচ্ছে, গাঁয়ে জটিল ইনফ্লেকশন বিশিষ্ট ভিনদেশি ভাষার শিরোনাম টাঙিয়ে নতুন নতুন সুপারশপ খোলা হচ্ছে, একদিকে এনজিও কর্মী অন্যদিকে মিশনারিদের আনাগোনা বাড়ছে, গ্রামের মানুষ দু’ বেলা ভাত জোগাড় করতে না পারলেও তাদের কাউকে কাউকে হ্যামবার্গারের উচ্ছিষ্টাংশ খেতে দেখা যাচ্ছে, সে মহাপ্রকল্পের দিকে তাদের আঙুল তাক করতে ভয় হয়। গাঁয়ের লোকেরা তাই যার যার হাত তার তার পকেটে ঢুকিয়ে রাখে।
৬.
শীঘ্রই, সম্পূর্ণ ভিন্ন নিরিখে একটি দিন এসে হাজির হয় কেন্দুয়াবাসীদের সম্মুখে। সেদিন ভোরে গাঁয়ের মুয়াজ্জিন ফজরের আযান দেয়ার জন্য রাতা মোরগের ডাকের অপেক্ষায় বসে থাকে। কিন্তু মোরগ আর ডাকে না। গ্রামে যারা ভোরবেলা মসজিদে গিয়ে জামাতে ফজরের নামাজ পড়তে অভ্যস্ত, অভ্যাসবসতই তাদের ঘুম ভেঙে যায় ঠিক সময়ে। খাটের ওপর ঝিম ধরে বসে তারাও অপেক্ষা করে মোরগের ডাক আর সুললিত কণ্ঠে মুয়াজ্জিনের আযানের। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত আযানের সুরের বদলে, গাঁয়ের দক্ষিণ দিক থেকে তাদের দিকে ভেসে আসে পাতালের গহিনে বন্দি নাম না জানা কোনো পশুর গোঙানোর শব্দের মতো ভয়ার্ত আওয়াজ। ঐ দিকেই করাতিয়া নদী আর গ্রাম মিশে একাকার হয়ে গেছে। সে আওয়াজ কি ঝোড়ো হাওয়ার, না বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের, না মেঘের গর্জনের, নাকি বিপন্ন প্রাণ ও প্রকৃতির বোবা ক্রন্দনের – গাঁয়ের মানুষেরা সেটা নিশ্চিত হতে পারে না। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তহীনতার ফলে আওয়াজ থেমে যায় না। রুহ জমিয়ে দেয়া সে ভীতিকর আওয়াজ থেমে থেমে ঝাপটা দিতে থাকে তাদের কর্ণকুহরে।
কিছু পর, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক ঘোলা, ধূসর আলো আকাশ থেকে ফুটে বেরুলে গাঁয়ের মানুষজন ডানেবামে চেয়ে দেখার সুযোগ পায়, এবং বোঝে, বৃষ্টি হয়েছে সারারাত। সে বৃষ্টি সকালেও থামেনি। রাতভর বৃষ্টির তোড়ে তাদের উঠোন তলিয়ে গেছে। খেতে পানি জমে গেছে। পুকুর আর পুকুরের পাড় মিলেমিশে প্রায় একাকার। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, সূচের মতো ধারালো ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি, আর মুহুর্মুহু বজ্রপাত মাথায় করে, পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, পিঁপড়ের মতো পিলপিল করে হাঁটতে হাঁটতে তারা এগিয়ে চলে করাতিয়া অভিমুখে, নদীর পানির অবস্থা দেখতে। কখনো তাদের পা পিছলে পিষ্ট করে মা মনসার ছানাপোনাদের, কখনো তাদের পা কেটে যায় ডাঙার খোঁজে জবুথবু হয়ে থাকা শামুকে। নানাভাবে আছড়ে-পিছড়ে অবশেষে তারা হাজির হয় করাতিয়ার তীরে।
তারা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
চিরচেনা নদীর চেহারা বদলে এ কি অবস্থা? নদীর তীর কই আর নদী কই, নদীর শেষ কই আর সমুদ্রের শুরু কই – কোনোকিছুই আর আলাদা করা যায় না। পারমাণবিক বর্জ্যের দূষণে থকথকে হয়ে থাকা নদীর পানিকে বনবিবি যেন নিজ হাতে পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিয়েছে। সমুদ্রের দিক থেকে ধেয়ে আসা ঝড় জলের প্লাবনে – আশকারায় উন্মত্ত হয়ে কেমন ফুঁসে উঠেছে সে! পানির রঙ্গে আকাশের ঘনকালো মেঘের প্রতিবিম্ব। থেকে থেকে নদীর পানি এখানে ওখানে পাক খেয়ে বড়ো বড়ো ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি করছে। বিশাল বিশাল স্রোত একটু পর পর আছড়ে পড়ছে নদীতীরে। নদীর জলসীমা এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে স্বাভাবিকের চে’ মিটারখানেক ওপরে।
“এমন ধারার বৃষ্টি হইলে তো আমাদের বেবাক জমি জিরেত, পুকুর আর মাছের ঘের ভাইসা যাবে …”
কেউ একজন আর্তনাদ করে ওঠে। বাকিরা কথা বলে না। শঙ্কিত চোখে তাকিয়ে থাকে নির্মম প্রতিশোধের নেশায় ফুঁসে ওঠা নদীর দিকে।
স্বল্প সময়ের নোটিশে গাঁয়ের ছেলেবুড়ো সবাই একত্রিত হয় জাকির চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠোনে। গাঁয়ের সবচেয়ে উঁচু এ বাড়ির উঠোনে এখনো পানি এসে পৌঁছায়নি।
সবাই নিশ্চুপ। কেউ মিটিং আরম্ভ করার জন্য বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না। এমন সময় দূর থেকে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে আসে এক আর্ত চিৎকার – “ওরে বাঁধ ভাঙি গেছে রে …!”
ডুকরে কেঁদে ওঠে নোয়াখালী থেকে আসা গাঁয়ের মসজিদের মৌলভি হাফিজদ্দি, “আঁই সাতার ন হারি, এই হানির মইদ্দে আঁই ডুবি মইরতে ছাই না …”
“আরে রাখো মিয়া মৌল্ভি তোমার মরণের ভয়!” রেগে চেঁচিয়ে ওঠেন গাঁয়ের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, সেতাব চাচা। তারপর জাকির চেয়ারম্যানের দিকে আঙুল তুলে বলেন – “তুমি … তুমি বলো বাবা, কি করা যায় অহন।“
“জোয়ান মর্দ পোলাপাইনরা হক্কলে মিলা যাবে বাঁধ মেরামত করতে,” জাকির চেয়ারম্যান, গাঁয়ের মোড়ল, বিপদে আপদে যার পেছনে গাঁয়ের সবাই আশ্রয় নেয়, সে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কথা বলা শুরু করে। “সেতাব চাচার বয়সি বুড়ো যারা আছেন, তারা বাড়ির মাইয়ামানুষ আর বাইচ্চাদের নিয়া গিয়া পাকা ইশকুল ঘরত গিয়া উঠবেন। আর আমাদের বয়সি যারা, আমরা বাড়ির গবাদি পশু, হাঁসমুরগি এগুলিরে উঁচা জায়গায় বান্ধি তারপর গিয়া হাত লাগাবো বাঁধ মেরামতে।“
জাকির চেয়ারম্যানের কথা শেষ হলেও সবাই নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। কেউ সহসা উঠতে চায় না। প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াইটা তাদের বড় অসম লাগে। মনে হয়, এই শাস্তি তাদের প্রাপ্যই। ইতোমধ্যে বানের পানি এসে জমেছে জাকির চেয়ারম্যানের উঠোনের দোরগোড়ায়। সে পানির রং কুচকুচে কালো। যে যার মনের গহিনে জমে থাকা ভয় উগরে দিতে থাকে একে একে। কারো গাভি এখন গর্ভবতী, কারো গোরু এই সেদিন মাত্র বাছুর জন্ম দিয়েছে। কারো আয় উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন অল্পকয়টা হাঁসমুরগি – এগুলো বানের পানিতে ডুবে গেলে কী করবে এই ভয়ে সে অস্থির। যারা একটু অবস্থাসম্পন্ন, তাদের পুকুরে চাষকৃত মাছ, আর নদীতে দেয়া মাছের ঘের – সবকিছু ভেসে যাবে। তাদের ক্ষয়ক্ষতি হবে লাখ টাকার। যাদের সহায় সম্বল বলতে কিছুই নেই, তাদের ঘরবাড়িটুকুও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কি না এই রাক্ষুসে বানের পানি – এই নিয়ে তাদের আর্তনাদ।
“এই জোয়ান পোলাপাইনডি, তোরা উঠ, বাইর হ অক্ষন!” জাকির চেয়ারম্যান রেগে চিৎকার করে উঠলে সবাই কথা থামিয়ে চুপ হয়ে যায় একদম। এমন সময় পানির বুকে ছপ ছপ ছপ আওয়াজ। মফিজ এসে দাঁড়ায় জাকির চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠানে। কিছুটা ঢালুমতন সে জায়গায় অনেকখানি পানি জমে গেছে। মফিজের প্রায় হাঁটু পর্যন্ত পানির নিচে। ওপরে মেঘে ঢাকা আঁধার ঘনা আকাশ, নিচে ক্ষুরধার কালো পানি। এরই মাঝে, তাদের পরিচিত এই লোকটাকে বেশ অনেকটা লম্বা আর লিকলিকে লাগে। যেন ওখানে একজন নয়, দু’জন মানুষ একে অপরের কাঁধের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।
“আপনারা ভয় পায়েন না। পানি যদ্দুর ঢুকার ঢুকছে গাঁয়ে। আর ঢুকপে না।“
গাঁয়ের সবাই বিস্ময় আর বিরক্তি মাখা চোখে তাকায় মফিজের দিকে।
“বানের পানি ঢুকবে না কেন?” সেতাব চাচা খেঁকিয়ে ওঠেন। “পানি তোর কোথা হুনবো হউরের পো?”
“আমি দউরাবো। আপনারা দেখপেন, পানি ঢুকপে না।“ মফিজ হাসিমুখে বলে।
চেয়ারম্যানের উঠোনে জড়ো হওয়া মানুষগুলো একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। শালা কামলাটা বলে কি?
“এই, যা তো তুই এখান থিকা, কামলার পো কামলা!” জাকির চেয়ারম্যান মেজাজ হারিয়ে ঝাড়ি দিয়ে বসেন মফিজকে। “আমগোর এখানে জান নিয়া টানাটানি, ও আইসা হাজির হইছে মশকরা করতে।“
“গাঁয়ের এই বিপদের সময় আমি মশকরা কইরতে আমু মামা, এ আপনি কইতে পারলেন!” মফিজের চেহারা দূর থেকে বিষণ্ণ লাগে।
“বিষয় হোলো গে, বৌয়ের লগে আমার রিলেশনে ইস্পারক ছিল না। তাই আমি দউরায়েছি এতগুলি দিন, যাতে ইস্পারক পয়দা হয়। আমার শইলে আধানের ঘাটতি ছিল, তাতে তো আমার বৌয়ের দোষ নেই।“
একটা স্যান্ডেল উড়ে গিয়ে পড়ে মফিজের আশেপাশে কোথাও। মফিজের গালগল্পে বিরক্ত হয়ে যে লোকটি চপ্পল ছুঁড়ে মেরেছে – আলোর অভাবে সে ঠিকমতো তাক করতে পারেনি।
“শইলে আধান নাই, তাই এতো দিন দউরায়ে দউরায়ে শরীরে বৈদ্যুতিক আধানের গতি জোগাড় করবার চেষ্টা করিছি। এখন ধরেন, বিদ্যুৎ যেটা তারের মইধ্য দিয়ে বয়ে যায়, ঐটার গতি অনেক। কিন্তু ছোট ছোট যে আধানগুলো মিলে একটা বিদ্যুতের স্রোত হয়, সে সিঙ্গেল আধানের গতি আবার কম, বুঝলেন আপনারা। আমি ওটাই জোগাড় করার চেষ্টা করিছি এতদিন।“
মফিজকে ঘিরে বানের কালো জল পাক খেতে থাকে। কিন্তু তাতে তাকে মোটেও চিন্তিত লাগে না।
“বৌয়ের লগে রিলেশনে আমার ইস্পারক নাই, তাই তো ছুটলাম এতদিন দাদুরা। ছুটতে ছুটতে দেখেন, এখন আমি ছুটলে ইস্পারক হয়। কিন্তুক ঘরত আর আমার বৌ নাই।“
মফিজের গলা এবার খানিকটা ভাঙা , খানিকটা খোনা শোনায়।
“ঘরে তোর বৌ নাই কেন রে?” জাকির চেয়ারম্যানকে বিভ্রান্ত লাগে। “নছিমন কই?”
“আমি তো সেই ভেইনরাত থিকা দউরাচ্ছি। তারপর বান উথলে উঠলো। এখন ধরেন, পানিতে তো আমার সমস্যা নাই। পানিতে বরং আমার শইলে ইস্পারক আরও বেশি অয়। এই দেখেন – “
মফিজ তার হাত দুটো সামনে মেলে ধরলে গাঁয়ের সবাই আঁতকে উঠে দেখে তার দুই হাতের তালুতে এবং ফুলে ওঠা শিরা উপশিরায় নীলাভ বিদ্যুতের স্রোত খেলে যাচ্ছে।
“দউরাতে দউরাতে যখন টের পেলাম, বানের পানি বেড়ে গ্যাছে অনেক, তখন আমার নছিমনের কথা মনে পড়লো। আমি ছুটনু আমার ঘরের পানে।“
গাঁয়ের লোকেরা ঠিক দেখে না ভুল দেখে, তারা নিজেরাও ঠাহর করতে পারে না। তারা দেখে, মফিজের চোখের মণি নীলবর্ণ ধারণ করেছে। তার লিকলিকে শরীরের শিরা – ধমনি বেয়ে থেকে থেকে নীল রঙের বিদ্যুতের স্রোত খেলে যাচ্ছে।
“বাড়ির দাওয়ায় এসে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে দেহি, বাড়ির পিছনের দরজা দি নছিমন একটা স্পিডবোট করি কই যেন চলি গেলো,“
একটু বিরতি নিয়ে মফিজ বলে, “ওটা এনজিওর স্পিডবোট আছিলো।“
আকাশের দিকে তাকিয়ে মফিজ কি মনে মনে অভিশাপ দেয় কাউকে? গাঁয়ের লোকেরা বুঝতে পারে না। হতভাগ্য লোকটার ব্যক্তিগত দুঃখ আর তাদের সামষ্টিক দুঃখ এক বিন্দুতে এসে মিলে যায়।
“নছিমনের স্পিডবোটে কি কাম, কন? ওর কি অন্যের আশ্রয় লাগে? কইলজাটা কাটি ভুনা করি দিতে পারি ওর লাগি, আর এই অল্প একটু পানি থেকে ওরে বাঁচাইতে পারতাম না? আমি তো অখন পানির উপর দিয়াও দউরাইতে পারি। ওর কি ডুবি মরণ লাগতো, আপনারাই কন?“
এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় মফিজের কথায় কারো অবিশ্বাস হয় না।
“জাউক,” মফিজ দু’হাতের পীঠ দিয়ে চোখ কচলায় কিছুক্ষণ। “আপনারা যার যার ঘরে যান। গিয়া উঠান থেকি সেচি পানি বাইরে নি ফালান। ঝড় থামলে, রউদ উঠলে পানি শুকাই যাবে। গ্রামের ভিতর আর পানি ঢুকপে না।“
বলে মফিজ উল্টোদিক ঘুরে ছুট লাগায় করাতিয়ার দিকে। বন্যাপীড়িত এই অভাগা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী এই গ্রামটিতে আমি বন্যার পর যখন ত্রাণ নিয়ে যাই, তখন যে ব্যক্তি আমাকে মফিজের এই গল্প শুনায়, সে বলে, তার মনে হয়েছিল যেন পুরাণের পাতা থেকে উঠে আসা এক দানো, পানির ওপরে দুদ্দাড় করে ছুটে হারিয়ে গেলো সবার চোখের সামনে দিয়ে।
সেদিন মফিজ তাদের চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পর যা ঘটে, তা মোটামুটি জনশ্রুতি আকারে কেন্দুয়া বা তার আশেপাশের গ্রামগুলিতে এখনো মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। ঘটনাপ্রবাহের কতক বিশ্বাসযোগ্য, কতক বিশ্বাসের অযোগ্য। কিন্তু যে অংশটুকু বিশ্বাসের অযোগ্য – তাও কেন্দুয়া এবং তার আশেপাশের গ্রামের মানুষজন বিশ্বাস করে নেয়, কেননা বিশ্বাস করাই তাদের কাজ। সমুদ্র উপকূলবর্তী এই খেটেখাওয়া গরীব মানুষগুলোর জীবনে অর্থকড়ি – বিলাস-বসনের অভাব থাকলেও শান্তির অভাব ছিল না। তাদের মাঝে প্রথমবারের মতো অশান্তি আমদানি করে রাজনীতিবিদেরা। তারা যখন তাদের বুঝিয়েছিল, স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর যত বিপর্যয়ই নেমে আসুক, দেশের জন্য, দশের জন্য কেন্দুয়ায় এই পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটা অত্যন্ত দরকার, তারা তা বিশ্বাস করে মেনে নিয়েছিল। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ধরন নষ্ট করে যখন এনজিওকর্মীরা এসে দাঁড়িয়েছিল তাদের দরজায়, নষ্ট করেছিল ঘরের ইজ্জত আব্রু, এই সাদাসিধে লোকগুলো তখন রুখে দাঁড়ায়নি। তারা বিশ্বাস করেছিল ভদ্র, শহুরে মানুষগুলোর মুখের মধুঝরা বুলিতে। বনবিবি, মা মনসা, আর গাজি পিরের গাঁথা যেখানে তাদের অন্তরকে উদ্ভাসিত করে বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু ধারণ করার শিক্ষা দিচ্ছিল, যে গ্রামে অনাদিকাল থেকে বজায় ছিল সর্বধর্ম সম্প্রীতি, সেখানে প্রথমবারের মতো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এনে প্রবেশ করায় মিশনারিরা। বিদেশি লোকগুলো তাদের লোকজ ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তিতর্কে, তত্ত্বতালাশে খারিজ করে, হেয় প্রতিপন্ন করে। কেন্দুয়ার এই সাদাসিধে মানুষগুলো তখনো অভিযোগ করেনি। সেই মিশনারিদের তারা বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো জায়গা করে দিয়েছিল নিজ বাড়ির আঙিনায়। ধর্মান্তরিতও হয়েছিল কেউ কেউ।
গাঁয়ের দু’ একজন তরুণ সে ভয়াল প্রহরে মফিজ আসলে কি করছে এটা দেখার জন্য বন্যাতাড়িত ভয়াল করাতিয়ার পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়, এবং ফিরে এসে বাকিদের জানায় যে করাতিয়ার তীরে গিয়ে তারা নির্দিষ্ট কাউকে খুঁজে পায়নি। বরং তারা দেখেছে – নীলরঙের এক আলোর ঝলক, বিদ্যুৎচমকের মতো, ক্রমাগত নদীর তীর এবং তাদের গ্রামের উত্তর পরিধিকে এত দ্রুতগতিতে চক্রাকারে আবর্তন করে চলেছে যে – বিদ্যুৎ প্রবাহের সে ঘূর্ণাবর্ত ভেদ করে বানের পানি তীরে উঠে আসতে পারছে না। এভাবে তারা বারবার ফিরে আসে করাতিয়ার পাড়ে, এবং একই দৃশ্য দেখতে পায়।
দিন গড়িয়ে রাত হয়। শেষরাতের দিকে ঝোড়ো হাওয়া স্তিমিত হয়ে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। পরদিন সকালে ফুটফুটে সূর্যের আলোর মাঝে তারা মফিজের মৃতদেহ খুঁজে পায় কিছুদিন আগে নদীতীরে মফিজের স্বহস্তে রোপণ করা খুদে সুন্দরী চারাগাছগুলোর মাঝে। নেমে যাওয়া বানের স্রোত তার লাশ হয়তো সঙ্গে টেনে নিয়ে যেতো নদী হয়ে সমুদ্রের মাঝে, কিন্তু সুন্দরী গাছের চারাগুলো মফিজের লাশকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল, যেমন এক মা, প্রচণ্ড শীতের রাতে তার শীতক্লিষ্ট শিশুকে আগলে রাখে নিজের শরীরের ওমে।
বানের পানি একসময় পুরোপুরি নেমে যায়। করাতিয়ার তীরে কেন্দুয়া পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের বড়ো বড়ো চুল্লি পুনরায় তাদের কালো ধোঁয়া উদ্গিরণ শুরু করে। নছিমনের আর কোনো হদিশ না পাওয়া গেলেও এনজিও নির্বাহী জামান সাহেব আবার ফিরে আসে কেন্দুয়ায়। গ্রামে বাইবেলের পাঠচক্র শুরু হয়। গ্রামের বিবাহিত মধ্যবয়স্ক পুরুষদের মাঝে দৌড়ানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
Subscribe for new writing
Sign up to receive new pieces of writing as soon as they are published as well as information on competitions, creative grants and more.



